রাশিয়া যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন? ইউরোপের স্বপ্ন এবং ভালো বেতনের আশায় অনেকেই এখন রাশিয়ার দিকে ঝুঁকছেন। কিন্তু যাওয়ার আগে সেখানকার কাজের ধরন, বাস্তব বেতন এবং আবহাওয়া সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা অত্যন্ত জরুরি।
আজকের এই আর্টিকেলে আমরা একজন প্রবাসীর অভিজ্ঞতার আলোকে রাশিয়ায় কাজের সুযোগ, বেতন এবং চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
রাশিয়ায় কোন কাজের চাহিদা বেশি?
বাংলাদেশ, ভারত বা পাকিস্তান থেকে যারা রাশিয়ায় যান, তাদের জন্য মূলত ৪-৫টি সেক্টরে কাজের সুযোগ সবচেয়ে বেশি থাকে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
-
কনস্ট্রাকশন বা নির্মাণ কাজ: রাশিয়ায় সবচেয়ে বেশি ওয়ার্ক পারমিট ভিসা হয় এই সেক্টরে।
-
ফ্যাক্টরি ওয়ার্কার: বিভিন্ন কারখানায় ইনডোর বা ভেতরের কাজ।
-
গার্মেন্টস: পোশাক শিল্পে কাজের সুযোগ।
-
ফুড প্যাকেজিং: খাবার প্যাকেটজাতকরণের কাজ।
তবে পরিসংখ্যান বলছে, রাশিয়ায় কনস্ট্রাকশন সেক্টরেই সবচেয়ে বেশি কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়।
রাশিয়ায় কাজের বেতন কত?
কাজের ধরন অনুযায়ী বেতনের পার্থক্য হয়ে থাকে। নিচে একটি ধারণা দেওয়া হলো:
১. কনস্ট্রাকশন কাজ (Construction)
কনস্ট্রাকশনের কাজ সাধারণত আউটডোর বা বাইরে করতে হয়। এই কাজে বেতন তুলনামূলক বেশি।
-
বেসিক স্যালারি: ৬০০ থেকে ৭০০ ডলার (বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ হাজার টাকা)।
-
ওভারটাইম: ওভারটাইম করার সুযোগ থাকলে মাসে ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করা সম্ভব।
২. ফ্যাক্টরি বা ইনডোর কাজ
ফ্যাক্টরি, গার্মেন্টস বা প্যাকেজিংয়ের কাজগুলো ইনডোর বা ছাদের নিচে হয়, তাই এখানে আবহাওয়া জনিত কষ্ট কম। তবে বেতনও কিছুটা কম।
-
বেসিক স্যালারি: ৫০০ থেকে ৫৫০ ডলার (বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৬০ হাজার টাকার আশেপাশে)।
-
সুযোগ-সুবিধা: ওভারটাইম থাকলে আয় সামান্য বাড়তে পারে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: রাশিয়ান কোম্পানিগুলো সাধারণত কর্মীদের থাকা এবং খাওয়ার খরচ বহন করে। তাই বেতনের পুরো টাকাটাই আপনি দেশে পাঠাতে বা সেভ করতে পারবেন।
রাশিয়ার আবহাওয়া
রাশিয়ায় যাওয়ার আগে যে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে ভাবা উচিত, তা হলো সেখানকার আবহাওয়া। আমরা বাংলাদেশে ৩০-৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস গরমে অভ্যস্ত। কিন্তু রাশিয়ার শীতকাল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
-
তাপমাত্রা: শীতকালে তাপমাত্রা মাইনাস ৩০ থেকে মাইনাস ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস (-40°C) পর্যন্ত নেমে যায়।
-
কাজের পরিবেশ: কনস্ট্রাকশনের কাজ বাইরে করতে হয়। টানা ১০-১১ ঘণ্টা এই তীব্র শীতে বা বরফের (Snow) মধ্যে কাজ করা অত্যন্ত কঠিন।
যাদের ঠান্ডা বা নিউমোনিয়ার সমস্যা আছে, তাদের জন্য আউটডোর বা কনস্ট্রাকশনের কাজ জীবননাশের কারণ হতে পারে। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজের শারীরিক সক্ষমতা যাচাই করুন।
রাশিয়া যেতে কত টাকা লাগে?
এখানে একটি বড় প্রতারণার ফাঁদ রয়েছে। একজন প্রবাসী কর্মীর বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়:
-
এজেন্সি বা দালাল খরচ: বাংলাদেশ থেকে এজেন্সির মাধ্যমে যেতে প্রায় ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা খরচ হয়।
-
প্রকৃত খরচ: অথচ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত বা নেপাল থেকে কর্মীরা মাত্র ১ থেকে ২ লাখ টাকা খরচ করে একই ভিসায় রাশিয়া যান।
-
ঋণের বোঝা: চড়া সুদে ঋণ নিয়ে বা জমি বিক্রি করে এত টাকা খরচ করে যাওয়ার পর, অনেকে চাইলেও প্রতিকূল পরিবেশে দেশে ফিরে আসতে পারেন না। ঋণের বোঝা তাদের বাধ্য করে অমানবিক কষ্ট সহ্য করে কাজ করতে।
নতুনদের জন্য পরামর্শ
আপনি যদি সত্যিই রাশিয়া যেতে চান, তবে নিচের টিপসগুলো মেনে চলুন:
১. ভাষা শিখুন: ইংরেজি বা রাশিয়ান ভাষা (Russian Language) জানা থাকলে আপনি অন্যদের চেয়ে বেশি সুযোগ-সুবিধা পাবেন। অন্তত বেসিক কথাবার্তা শিখে দেশ ছাড়ুন।
২. কাজের ধরন বুঝুন: কনস্ট্রাকশন কাজে বেশি টাকা থাকলেও, আপনি আউটডোরে কাজ করতে পারবেন কিনা তা ভাবুন। ইনডোর কাজ নিরাপদ এবং আরামদায়ক।
৩. সঠিক মাধ্যমে যান: দালাল এড়িয়ে বিশ্বস্ত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কম খরচে যাওয়ার চেষ্টা করুন।
শেষ কথা
রাশিয়া একটি সম্ভাবনাময় দেশ হতে পারে যদি আপনি সঠিক কাজ এবং সঠিক প্রস্তুতি নিয়ে যান। তবে হুজুগে না মেতে, ঠান্ডা আবহাওয়া এবং কাজের ধরণ সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে সিদ্ধান্ত নিন।
আপনার কি রাশিয়া ভিসা নিয়ে আরও কোনো প্রশ্ন আছে? নিচে কমেন্ট করে জানান।
আমি একটি প্রাইভেট ভিসা প্রসেসিং কোম্পানিতে জব করি। পাশাপাশি এই ব্লগটিতে লেখালেখি করি। আমি ব্রাক ইউনিভার্সিটে থেকে এমবিএ করেছি।