বর্তমানে বাংলাদেশিদের জন্য দুবাই ভিজিট ভিসা (Visit Visa) এবং স্কিলড বা দক্ষ কর্মীদের ওয়ার্ক ভিসা (Skilled Work Visa) চালু রয়েছে। তবে সাধারণ শ্রমিক বা ‘আনস্কিলড’ ক্যাটাগরির ভিসার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি বা অঘোষিত সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। সরকারিভাবে কোনো “ব্ল্যাঙ্কেট ব্যান” (Blanket Ban) বা সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা নেই, তবে ভিসা প্রসেসিংয়ে আগের চেয়ে বেশি সময় লাগছে এবং যাচাই-বাছাই কঠোর করা হয়েছে।
দুবাই বা সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE) প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য অন্যতম প্রধান শ্রমবাজার। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে ভিসা নিয়ে নানা জটিলতা, গুজব এবং নিয়ম পরিবর্তনের ফলে অনেকেই বিভ্রান্ত। “দুবাই ভিসা কবে খুলবে” বা “বর্তমানে দুবাই ভিসা চালু আছে কি না” এই প্রশ্নটি এখন সবার মনে।
এই আর্টিকেলে আমরা ২০২৫-২০২৬ সালের সর্বশেষ তথ্য, ভিসা পাওয়ার নিয়ম, খরচ এবং দালালদের প্রতারণা থেকে বাঁচার উপায় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
বর্তমানে দুবাই ভিসার সর্বশেষ পরিস্থিতি
২০২৫ সালের শেষের দিকে এবং ২০২৬-এর শুরুতে দুবাই ভিসা নিয়ে বিভিন্ন খবর শোনা যাচ্ছে। পরিস্থিতি মূলত দুই ভাগে বিভক্ত:
১. ভিজিট ভিসা (Visit Visa)
-
স্ট্যাটাস: ✅ চালু আছে।
-
বাংলাদেশিরা এখন ৩০ বা ৬০ দিনের ভিজিট ভিসায় দুবাই যেতে পারছেন।
-
শর্ত: ভ্রমণের আগে অবশ্যই কনফার্ম হোটেল বুকিং এবং রিটার্ন টিকেট থাকতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে নূন্যতম অর্থের (Show Money) প্রমাণ দেখাতে হতে পারে।
২. ওয়ার্ক বা কাজের ভিসা (Work Visa)
-
স্ট্যাটাস: ⚠️ সীমিত (Restricted)।
-
উচ্চ দক্ষ (Skilled): ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইটি প্রফেশনাল বা যাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও বেতন নির্দিষ্ট সীমার উপরে, তাদের ভিসা প্রসেসিং হচ্ছে।
-
সাধারণ শ্রমিক (Unskilled): কনস্ট্রাকশন বা সাধারণ লেবার ভিসার ক্ষেত্রে অনুমোদন পাওয়া কিছুটা কঠিন হচ্ছে। অনেক সময় কোম্পানি কোটা বা ন্যাশনালিটি সমস্যার কারণে ভিসা রিজেক্ট হতে পারে।
সতর্কতা: সম্প্রতি কিছু ভুয়া নিউজ পোর্টালে “বাংলাদেশসহ ৯টি দেশের ভিসা বন্ধ” এমন খবর ছড়িয়েছিল। তবে UAE-তে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস নিশ্চিত করেছে যে, সরকারিভাবে এমন কোনো ঘোষণা আসেনি। এটি মূলত গুজব বা সাময়িক কড়াকড়ি হতে পারে।
দুবাই ভিসা কেন বন্ধ থাকে বা দেরি হয়?
ভিসা প্রসেসিংয়ে ধীরগতি বা রিজেকশনের পেছনে কয়েকটি মূল কারণ রয়েছে:
-
ফেক ডকুমেন্ট: ভুয়া শিক্ষাগত সনদ বা এনওসি (NOC) ব্যবহার করা।
-
ওভারস্টে (Overstay): ভিজিট ভিসায় গিয়ে নির্দিষ্ট মেয়াদের পর ফিরে না আসা।
-
ক্রাইম রেট: প্রবাসীদের দ্বারা আইন লঙ্ঘনের ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়া।
-
কোটা সিস্টেম: কোম্পানিগুলোর নির্দিষ্ট দেশের কর্মী নিয়োগের কোটা পূরণ হয়ে যাওয়া।
দুবাই ভিসার দাম কত?
টাকার মান পরিবর্তনশীল, তবে দিরহামের (AED) হিসাবে সরকারি ফি-এর একটি ধারণা নিচে দেওয়া হলো (এজেন্সি চার্জ আলাদা হতে পারে):
| ভিসার ধরন | মেয়াদ | আনুমানিক সরকারি ফি (AED) |
| ভিজিট ভিসা (সিঙ্গেল) | ৩০ দিন | ৩৫০ – ৪৫০ AED |
| ভিজিট ভিসা (সিঙ্গেল) | ৬০ দিন | ৫০০ – ৬০০ AED |
| জব সিকার ভিসা | ৬০/৯০/১২০ দিন | ৫০০ – ১০০০ AED (ভিন্নতা আছে) |
| রেসিডেন্স/পার্টনার ভিসা | ২ বছর | ৩০০০+ AED (মেডিকেল ও অন্যান্য সহ) |
বি:দ্র: দালাল বা এজেন্সির মাধ্যমে করলে সার্ভিস চার্জ যুক্ত হয়ে খরচ বাড়বে।
ভিসা খোলার ব্যাপারে সুখবর কবে আসবে?
বিশেষজ্ঞদের মতে এবং কূটনৈতিক তৎপরতা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে সাধারণ শ্রমিকদের ভিসার জট খোলার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশ সরকার এবং ইউএই কর্তৃপক্ষের মধ্যে নিয়মিত দ্বিপাক্ষিক আলোচনা চলছে।
আপনার করণীয়:
-
কোনো দালালের কথায় অগ্রিম টাকা দেবেন না।
-
ভিসা “ইলেকট্রনিক” বা “ই-ভিসা” হলে অনলাইনে চেক করা যায়। চেক না করে টাকা লেনদেন করবেন না।
-
শুধুমাত্র নামী এবং লাইসেন্সপ্রাপ্ত রিক্রুটিং এজেন্সির সহায়তা নিন।
অনলাইনে দুবাই ভিসা চেক করার নিয়ম
প্রতারণা এড়াতে আপনার ভিসা আসল না নকল, তা নিজেই যাচাই করুন:
-
ICP ওয়েবসাইট: ভিজিট করুন
smartservices.icp.gov.ae। -
পাবলিক সার্ভিস: ‘Public Services’ মেনু থেকে ‘File Validity’ অপশনে যান।
-
তথ্য দিন: পাসপোর্ট নম্বর, এক্সপায়ারি ডেট এবং ন্যাশনালিটি সিলেক্ট করুন।
-
ফলাফল: ভিসা আসল হলে সিস্টেম আপনার নাম, ভিসার মেয়াদ এবং স্ট্যাটাস দেখাবে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
হ্যাঁ, ভিজিট ভিসা এবং দক্ষ পেশাজীবীদের জন্য ওয়ার্ক ভিসা চালু আছে। সাধারণ লেবার ভিসায় কিছুটা সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
২. ফ্যামিলি ভিসা কি চালু আছে?
যাদের দুবাইতে ভ্যালিড রেসিডেন্সি আছে এবং নির্দিষ্ট বেতন (সাধারণত ৪০০০ দিরহাম বা তার বেশি) পান, তারা তাদের পরিবারের জন্য ফ্যামিলি ভিসা বা স্পন্সর ভিসা নিতে পারছেন।
৩. ভিজিট ভিসায় গিয়ে কি কাজ করা যায়?
আইনত ভিজিট ভিসায় কাজ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ধরা পড়লে জেল বা জরিমানা হতে পারে। তবে ভিজিট ভিসায় গিয়ে কাজ খুঁজে পেলে, কোম্পানি যদি আপনার স্ট্যাটাস পরিবর্তন (Status Change) করে এমপ্লয়মেন্ট ভিসা লাগিয়ে দেয়, তবেই আপনি বৈধভাবে কাজ করতে পারবেন।
৪. ভিসা কবে পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে?
এর কোনো নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করা হয়নি। তবে কূটনৈতিক আলোচনা সফল হলে খুব শীঘ্রই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলে আশা করা যায়। নিয়মিত আপডেটের জন্য বিশ্বস্ত নিউজ পোর্টালগুলোতে নজর রাখুন।
লেখকের শেষ কথা
“দুবাই ভিসা খুলবে” এই আশায় বসে না থেকে নিজেকে দক্ষ হিসেবে গড়ে তোলাই বুদ্ধিমানের কাজ। কারিগরি দক্ষতা থাকলে (যেমন: ইলেকট্রিশিয়ান, ড্রাইভিং, এসি টেকনিশিয়ান) ভিসা পাওয়া অনেক সহজ। গুজবে কান না দিয়ে সরকারি ওয়েবসাইট (MOHRE, ICP) বা বিএমইটি (BMET)-এর তথ্য অনুসরণ করুন।
ডিসক্লেইমার: ভিসা সংক্রান্ত নিয়ম ও ফি পরিবর্তনশীল। কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে সর্বশেষ সরকারি ঘোষণা যাচাই করে নিন। এই আর্টিকেলটি তথ্য প্রদানের উদ্দেশ্যে লিখিত।
আমি একটি প্রাইভেট ভিসা প্রসেসিং কোম্পানিতে জব করি। পাশাপাশি এই ব্লগটিতে লেখালেখি করি। আমি ব্রাক ইউনিভার্সিটে থেকে এমবিএ করেছি।