বাংলাদেশে ই-পাসপোর্ট করার প্রক্রিয়াটি এখন আগের চেয়ে অনেক সহজ ও ডিজিটাল। কিন্তু সঠিক তথ্যের অভাবে অনেকেই আবেদন করতে গিয়ে ভুল করেন, যার ফলে পাসপোর্ট পেতে দেরি হয়। আজকের এই গাইডে আমরা ধাপে ধাপে জানব কীভাবে ঘরে বসে নির্ভুলভাবে ই-পাসপোর্টের আবেদন করবেন, ফি কত, পুলিশ ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া এবং দ্রুত পাসপোর্ট পাওয়ার উপায়।
ই-পাসপোর্ট করতে কী কী কাগজপত্র লাগে?
আবেদন শুরু করার আগে হাতের কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র রাখা জরুরি। তথ্যের গরমিল থাকলে আপনার পাসপোর্ট আটকে যেতে পারে।
মূল কাগজপত্র:
-
জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) বা জন্ম নিবন্ধন: ১৮ বছরের বেশি হলে NID বাধ্যতামূলক। ১৮ বছরের নিচে হলে অনলাইন জন্ম নিবন্ধন কপি।
-
নাগরিক সনদ: স্থানীয় চেয়ারম্যান বা কাউন্সিলরের সনদ (কিছু ক্ষেত্রে প্রয়োজন হতে পারে)।
-
পেশার প্রমাণপত্র: চাকরিজীবী হলে এনওসি (NOC) বা স্টুডেন্ট হলে আইডি কার্ড।
-
পূর্ববর্তী পাসপোর্ট: যদি আগে কোনো এমআরপি (MRP) পাসপোর্ট থাকে।
-
পেমেন্ট স্লিপ: ব্যাংক বা অনলাইনে টাকা জমার প্রিন্ট কপি।
-
আবেদন ফরমের প্রিন্ট কপি: অনলাইনে পূরণ করা ফরমের সারসংক্ষেপ।
ই-পাসপোর্ট ফি কত ২০২৬?
পাসপোর্টের মেয়াদ (৫ বা ১০ বছর) এবং পৃষ্ঠা সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে ফি ভিন্ন হয়। নিচে ভ্যাটসহ (১৫%) সর্বশেষ ফি তালিকা দেওয়া হলো:
৪৮ পৃষ্ঠার পাসপোর্ট:
| ডেলিভারি ধরন | ৫ বছর মেয়াদ | ১০ বছর মেয়াদ | সম্ভাব্য সময় |
| রেগুলার | ৪,০২৫ টাকা | ৫,৭৫০ টাকা | ১৫-২১ কর্মদিবস |
| এক্সপ্রেস | ৬,৩২৫ টাকা | ৮,০৫০ টাকা | ৭-১০ কর্মদিবস |
| সুপার এক্সপ্রেস | ৮,৬২৫ টাকা | ১০,৩৫০ টাকা | ২ কর্মদিবস |
৬৪ পৃষ্ঠার পাসপোর্ট:
| ডেলিভারি ধরন | ৫ বছর মেয়াদ | ১০ বছর মেয়াদ |
| রেগুলার | ৬,৩২৫ টাকা | ৮,০৫০ টাকা |
| এক্সপ্রেস | ৮,৬২৫ টাকা | ১০,৩৫০ টাকা |
| সুপার এক্সপ্রেস | ১২,০৭৫ টাকা | ১৩,৮০০ টাকা |
সতর্কতা: সুপার এক্সপ্রেস ডেলিভারি শুধুমাত্র তাদের জন্য প্রযোজ্য যাদের আগে পুলিশ ভেরিফিকেশন করা আছে বা সরকারি চাকরিজীবী।
ধাপে ধাপে ই-পাসপোর্ট আবেদনের নিয়ম
চলুন বিস্তারিত জেনে নিই কীভাবে নিজেই আবেদন করবেন।
ধাপ ১: অনলাইন রেজিস্ট্রেশন
প্রথমে epassport.gov.bd ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন। আপনার জেলা ও থানার নাম সিলেক্ট করে ইমেইল দিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলুন।
ধাপ ২: তথ্য পূরণ (Personal Information)
NID কার্ড অনুযায়ী আপনার নাম, বাবার নাম, মায়ের নাম ও জন্ম তারিখ হুবহু ইংরেজিতে লিখুন। কোনো বানান ভুল হলে পরবর্তীতে ঝামেলায় পড়বেন।
-
টিপস: NID-তে যদি নামের বানান ভুল থাকে, তবে আগে NID সংশোধন করে তারপর পাসপোর্টের আবেদন করুন।
ধাপ ৩: পেমেন্ট বা ফি প্রদান
আবেদন সাবমিট করার পর পেমেন্ট অপশন আসবে। আপনি চাইলে ‘A-Challan’ এর মাধ্যমে বিকাশ, রকেট, নগদ বা যেকোনো ব্যাংকের কার্ড দিয়ে টাকা জমা দিতে পারেন। পেমেন্ট স্লিপটি প্রিন্ট করে যত্ন করে রাখুন।
ধাপ ৪: অ্যাপয়েন্টমেন্ট ও বায়োমেট্রিক
ফি জমা দেওয়ার পর পাসপোর্ট অফিসে যাওয়ার জন্য একটি তারিখ (Appointment Date) সিলেক্ট করতে হবে। নির্ধারিত দিনে সব কাগজপত্রের মূল কপি ও ফটোকপি নিয়ে পাসপোর্ট অফিসে উপস্থিত হোন। সেখানে আপনার ছবি তোলা হবে, চোখের আইরিস ও আঙুলের ছাপ নেওয়া হবে।
পুলিশ ভেরিফিকেশন
বায়োমেট্রিক সম্পন্ন হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যে আপনার মোবাইলে পুলিশ ভেরিফিকেশনের জন্য মেসেজ আসবে বা পুলিশ অফিসার কল করবেন।
পুলিশ ভেরিফিকেশনে যা দেখে:
-
আপনি ওই ঠিকানায় বাস্তবে থাকেন কি না।
-
আপনার বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা আছে কি না।
-
আপনার নাম ও বাবার নামের সাথে তথ্যের মিল আছে কি না।
বিদ্রষ্টব্য: নতুন নিয়মে আপনার যদি আগে এমআরপি পাসপোর্ট থাকে এবং তথ্যের কোনো পরিবর্তন না করেন, তবে পুলিশ ভেরিফিকেশন প্রয়োজন নাও হতে পারে।
ই-পাসপোর্ট চেক করার নিয়ম
আবেদন করার পর আপনার পাসপোর্ট কোন অবস্থায় আছে তা জানা খুব সহজ।
১. ই-পাসপোর্ট পোর্টালে যান।
২. মেনু থেকে “Check Status” এ ক্লিক করুন।
৩. আপনার Online Registration ID (OID) এবং জন্ম তারিখ দিন।
কিছু সাধারণ স্ট্যাটাস ও অর্থ:
-
Enrollment in Process: আপনার আবেদনটি প্রক্রিয়াধীন আছে।
-
Pending for Police Approval: পুলিশ ভেরিফিকেশন রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে।
-
Shipped: পাসপোর্ট তৈরি হয়ে আঞ্চলিক অফিসে পাঠানো হয়েছে।
-
Ready for Delivery: পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে পাসপোর্ট আনতে পারবেন।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন ও উত্তর
পাঠকদের মনে যেসব প্রশ্ন প্রায়ই জাগে, তার উত্তর এখানে দেওয়া হলো:
১. ই-পাসপোর্ট হতে কত দিন সময় লাগে?
উত্তর: রেগুলার ডেলিভারিতে সাধারণত ১৫ থেকে ২১ কর্মদিবস লাগে। তবে পুলিশ ভেরিফিকেশন ও প্রিন্টিং জটের কারণে মাঝে মাঝে ১ মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
২. এনআইডি ছাড়া কি পাসপোর্ট করা যায়?
উত্তর: ১৮ বছরের নিচে হলে জন্ম নিবন্ধন দিয়ে পাসপোর্ট করা যায়। তবে ১৮ বছরের বেশি হলে এনআইডি (NID) বাধ্যতামূলক। এনআইডি না থাকলে আগে সেটি তৈরি করতে হবে।
৩. পাসপোর্টের ভুল সংশোধন করব কীভাবে?
উত্তর: পাসপোর্টে যদি নাম বা বয়সে ভুল থাকে, তবে সেটি সংশোধনের জন্য আগে এনআইডি বা জেএসসি/এসএসসি সার্টিফিকেট সংশোধন করতে হবে। এরপর রি-ইস্যু (Re-issue) আবেদন করে সংশোধিত তথ্য ও প্রমাণপত্র জমা দিতে হবে।
৪. ই-পাসপোর্ট কি রিনিউ করা যায়?
উত্তর: ই-পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হলে বা পাতা ফুরিয়ে গেলে সেটি রিনিউ করতে হয়। প্রক্রিয়াটি নতুন আবেদনের মতোই, শুধু পুলিশ ভেরিফিকেশন সব ক্ষেত্রে লাগে না।
পরামর্শ
একজন অভিজ্ঞ বা ট্রাভেলার হিসেবে আমার পরামর্শ হলো পাসপোর্ট করার সময় তাড়াহুড়ো করবেন না। আবেদনের সময় Permanent Address এবং Present Address সতর্কতার সাথে পূরণ করুন। কারণ পুলিশ ভেরিফিকেশন মূলত এই ঠিকানাতেই হবে। এছাড়া, পাসপোর্ট অফিসের দালালদের থেকে দূরে থাকুন। সরকারি নিয়ম মেনে সঠিক কাগজপত্র নিয়ে গেলে আপনি কোনো হয়রানি ছাড়াই সহজে পাসপোর্ট পাবেন।
গুরুত্বপূর্ণ লিংক:
-
অফিসিয়াল ওয়েবসাইট: epassport.gov.bd
-
ফি জমার সাইট: ekpay.gov.bd
আমি একটি প্রাইভেট ভিসা প্রসেসিং কোম্পানিতে জব করি। পাশাপাশি এই ব্লগটিতে লেখালেখি করি। আমি ব্রাক ইউনিভার্সিটে থেকে এমবিএ করেছি।