সকালে ঘুম ভাঙতেই হঠাৎ মনে হলো, “ইশ, বিদেশে গেলে জীবনটা একটু অন্যরকম হতো!”?
বিশ্বাস করুন, এই চিন্তা শুধু আপনার একার নয়। আমিও একসময় গুগলে “সরকারি ভাবে বিদেশ যাওয়ার উপায়” লিখে অনেকবার খুঁজেছি। কিন্তু ইন্টারনেটের বেশিরভাগ তথ্য এতই জটিল যে পড়লে মাথা ঘুরে যায়, মনে হয় যেন রকেট সায়েন্সের গাইড পড়ছি!
তাই ভাবলাম, আজ একদম সহজ করে, চা খেতে খেতে আড্ডা দেওয়ার মতো করে পুরো ব্যাপারটা আপনাকে বুঝিয়ে বলি। কোনো কঠিন শব্দ বা জটিল প্রসেস নয়, শুধু কাজের কথা।
যেন আপনি আরামসে আপনার স্বপ্নটাকে গুছিয়ে নিতে পারেন।
সরকারিভাবে, অর্থাৎ কোনো দালাল বা থার্ড পার্টি ছাড়া, বিদেশ যাওয়ার সবচেয়ে নিরাপদ এবং কম খরচের ৭টি উপায় নিচে দেওয়া হলো।
BMET রেজিস্ট্রেশন
বিদেশ যাওয়ার কথা ভাবলে, আপনার প্রথম এবং সবচেয়ে জরুরি কাজটি হলো BMET-তে নাম লেখানো।
BMET (Bureau of Manpower, Employment and Training) হলো সরকারের একটি খাতা, যেখানে বিদেশ যেতে ইচ্ছুক সব কর্মীর তথ্য থাকে। এই রেজিস্ট্রেশন ছাড়া আপনি বৈধভাবে কাজের জন্য বিদেশ যেতেই পারবেন না।
কেন এটা এত জরুরি?
-
বৈধভাবে বিদেশে চাকরি পেতে।
-
সরকারি ছাড়পত্র (Emigration Clearance) পেতে।
-
সরকারিভাবে স্কিল ট্রেনিং বা প্রশিক্ষণের জন্য আবেদন করতে।
কীভাবে করবেন? সবচেয়ে সহজ উপায় হলো গুগল প্লে স্টোর থেকে “আমি প্রবাসী” (Ami Probashi) অ্যাপটি ডাউনলোড করা। এই অ্যাপ দিয়ে আপনি ঘরে বসেই পাসপোর্ট নম্বর দিয়ে প্রাথমিক রেজিস্ট্রেশন করে ফেলতে পারবেন। এরপর শুধু নির্দিষ্ট তারিখে আপনার জেলার BMET অফিসে গিয়ে ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়ে এলেই আপনার কাজ শেষ। আপনার নামে একটি BMET স্মার্ট কার্ড তৈরি হয়ে যাবে।
ছোট্ট টিপস: আপনার এই BMET প্রোফাইলটাকে নিজের সিভির মতোই গুরুত্ব দিন। যখনই নতুন কোনো কাজ শিখবেন বা নতুন সার্টিফিকেট পাবেন, এখানে আপডেট করে নেবেন।
[Image Suggestion: “আমি প্রবাসী” অ্যাপের ড্যাশবোর্ডের একটি স্ক্রিনশট]
BOESL
BOESL (Bangladesh Overseas Employment Services Limited) হলো বিদেশে লোক পাঠানোর একমাত্র সরকারি কোম্পানি বা এজেন্সি।
সহজ কথায়, এখানে চাকরি খোঁজা মানে হলো:
-
দালাল নেই: আপনি সরাসরি সরকারের সাথে ডিল করছেন।
-
খরচ একদম কম: সরকার নির্ধারিত খরচে (অনেক সময় শুধু প্লেন ভাড়া আর সামান্য সার্ভিস চার্জ) সব হয়।
-
ধোঁকা খাওয়ার ভয় নেই: চাকরি ১০০% ভেরিফাইড এবং নিরাপদ।
BOESL-এর মাধ্যমে দক্ষিণ কোরিয়া, জর্ডান, জাপান, রোমানিয়া, যুক্তরাজ্য (নার্সিং) সহ অনেক দেশে যাওয়া যায়। আপনার কাজ হলো নিয়মিত এদের ওয়েবসাইটে (boesl.gov.bd) চোখ রাখা, কখন আপনার যোগ্যতার সাথে মেলে এমন চাকরির সার্কুলার আসে।
EPS (কোরিয়া) এবং G2G
এটা হলো বিদেশ যাওয়ার VIP পথ। G2G মানে হলো “গভর্নমেন্ট-টু-গভর্নমেন্ট”। এখানে এক দেশের সরকার আরেক দেশের সরকারের সাথে চুক্তি করে লোক নেয়। মাঝখানে কোনো প্রাইভেট কোম্পানির হাত নেই।
-
সবচেয়ে জনপ্রিয় উদাহরণ: দক্ষিণ কোরিয়ার EPS (Employment Permit System)।
-
প্রসেস: আপনাকে কোরিয়ান ভাষা পরীক্ষায় (EPS-TOPIK) পাস করতে হবে। এরপর স্কিল টেস্ট, মেডিকেল এবং সরাসরি চাকরি। BOESL এই পুরো প্রক্রিয়াটি ম্যানেজ করে।
-
কেন সেরা? বেতন অনেক ভালো (লাখ টাকার বেশি), থাকা-খাওয়ার সুবিধা থাকে এবং পুরো প্রক্রিয়া খুবই স্বচ্ছ।
জাপান, মালয়েশিয়াতেও মাঝে মাঝে এমন G2G প্রসেসে লোক নেয়। সব খবর BOESL-এর নোটিশ বোর্ডেই পাবেন।
[Image Suggestion: দক্ষিণ কোরিয়ার EPS লটারি বা লোগোর একটি ছবি]
সরকারি স্কিল ট্রেনিং
ভাবছেন, “আমি তো কোনো কাজই ভালো পারি না, বিদেশে কী করবো?”
আপনার জন্যই সরকার সারা দেশে TTC (টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার) খুলে রেখেছে।
-
কী শেখানো হয়? ইলেকট্রিশিয়ান, ওয়েল্ডিং, ড্রাইভিং, হাউসকিপিং, প্লাম্বিং, নার্সিং বা কেয়ারগিভার, কম্পিউটার—এমন সব কাজের ট্রেনিং দেওয়া হয়, যেগুলোর বিদেশে প্রচুর চাহিদা।
-
লাভ কী? এই সার্টিফিকেট থাকলে আপনার চাকরির সুযোগ অন্যদের চেয়ে বহুগুণ বেড়ে যায়। আপনি ‘অদক্ষ কর্মী’ (Unskilled Labour) হিসেবে না গিয়ে, ‘দক্ষ কর্মী’ (Skilled Worker) হিসেবে বেশি বেতনে যেতে পারবেন।
স্টুডেন্ট ভিসা
চাকরি নয়, বিদেশে থেকে ভালো মানের পড়াশোনা করতে চান? এটাও সরকারিভাবে গোছানো সম্ভব।
-
কীভাবে? আপনি যখন কানাডা, ইউকে, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি বা জাপানের মতো দেশে কোনো ইউনিভার্সিটিতে অ্যাপ্লাই করেন, তখন আপনার সব শিক্ষাগত সার্টিফিকেট (SSC, HSC, অনার্স) শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সত্যায়িত (Attested) করতে হয়। এটাই সরকারি প্রসেস।
-
মনে রাখবেন: এটা কিন্তু ‘কাজের ভিসা’ নয়। আপনাকে সত্যি সত্যি পড়তে হবে। তবে পড়াশোনার পাশাপাশি পার্ট-টাইম জবের বৈধ সুযোগ থাকে।
সরকারি স্কলারশিপ
এটাকে বলা যায় ‘বিনা খরচে’ বিদেশ যাওয়ার উপায়। যদি আপনার একাডেমিক রেজাল্ট খুব ভালো হয়, তবে আপনি সরকারি স্কলারশিপের জন্য চেষ্টা করতে পারেন।
-
বিখ্যাত স্কলারশিপ: বঙ্গবন্ধুর নামে বিশেষ স্কলারশিপ, কমনওয়েলথ স্কলারশিপ, বা বিভিন্ন দেশের সরকারি স্কলারশিপ (যেমন জাপানের MEXT, ইউকের Chevening, হাঙ্গেরি বা চীনের সরকারি স্কলারশিপ)।
-
সুবিধা: থাকা, খাওয়া, টিউশন ফি—সবকিছু সরকার বা ওই প্রতিষ্ঠান বহন করে। আপনাকে শুধু মন দিয়ে পড়াশোনা করতে হবে।
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়
আপনি যেভাবেই যান না কেন, আপনার মাথার ওপর ছাতা হয়ে আছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।
এরাই BMET এবং BOESL-কে চালায়। এরাই ঠিক করে বিদেশে যেতে কত টাকা লাগবে। আপনার ভিসা বা চুক্তিপত্র আসল না নকল, তা এদের ওয়েবসাইট থেকে চেক করতে পারবেন। বিদেশে কোনো সমস্যায় পড়লে এরাই আপনাকে দেশে বা বিদেশে আইনি সাপোর্ট দেয়।
কিছু জরুরি প্রশ্ন (FAQs)
১. সরকারি ভাবে বিদেশ যেতে কী কী কাগজ লাগে?
-
পাসপোর্ট: অবশ্যই থাকতে হবে এবং কমপক্ষে ৬ মাস মেয়াদ থাকতে হবে।
-
ন্যাশনাল আইডি কার্ড (NID): পাসপোর্টের সাথে নাম-ঠিকানা মিল থাকতে হবে।
-
BMET স্মার্ট কার্ড: (কাজের ভিসার জন্য)
-
পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট: প্রমাণ করার জন্য যে আপনার নামে কোনো ক্রিমিনাল রেকর্ড নেই।
-
মেডিকেল রিপোর্ট: আপনি সুস্থ, তার প্রমাণ।
-
চাকরির চুক্তিপত্র: (যদি কাজের ভিসায় যান)
২. সরকারি ভাবে বিদেশ যেতে কত টাকা লাগে? এটা দেশ আর কাজের ওপর নির্ভর করে।
-
কোরিয়ার EPS-এ: খরচ খুবই কম (সব মিলিয়ে ১ লাখের আশেপাশে)।
-
BOESL-এর মাধ্যমে: খরচ অনেক কম (সরকার নির্ধারিত)।
-
স্টুডেন্ট ভিসায়: খরচ মাঝারি থেকে বেশি (ইউনিভার্সিটির টিউশন ফি-এর ওপর)।
-
স্কলারশিপে: খরচ প্রায় শূন্য।
৩. দালাল ছাড়া কি সত্যি বিদেশ যাওয়া যায়? ১০০% যায়। এই পুরো গাইডটাই দালাল ছাড়া যাওয়ার উপায়। BOESL এবং BMET থাকার কারণেই এখন আর দালালের দরকার হয় না। নিজে একটু সচেতন থাকলেই সম্ভব।
৪. কোন ভুলগুলো করা যাবে না?
-
অতিরিক্ত লোভনীয় অফার (যেমন ‘২ লাখ টাকায় কানাডা/আমেরিকা’) দেখেই বিশ্বাস করা।
-
নিজের কোনো তথ্য (যেমন অসুখ, বা শিক্ষাগত যোগ্যতা) লুকানো।
-
চুক্তিপত্র বা অফার লেটার না পড়েই টাকা দেওয়া বা সই করা।
শেষ কথা
বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখাটা খুব স্বাভাবিক। এই স্বপ্নটা পূরণের উত্তেজনা যেমন আছে, একটু ভয়ও থাকে।
কিন্তু আপনি যদি তাড়াহুড়ো না করে, সঠিক সরকারি পথে, আইন মেনে এগোন, তবে এই যাত্রাটা খুব সুন্দর আর নিরাপদ হয়। আপনার নতুন জীবনের শুরুটাই হয় আত্মবিশ্বাস দিয়ে, কোনো ঋণের বোঝা বা অবৈধ হয়ে যাওয়ার ভয় নিয়ে নয়।
তাহলে, আপনার প্রথম পদক্ষেপ কী? আজই কি ‘আমি প্রবাসী’ অ্যাপে রেজিস্ট্রেশন করছেন, নাকি BOESL-এর ওয়েবসাইটে ঢুঁ মারছেন?
আপনার স্বপ্নের দেশ কোনটি, কমেন্টে জানাতে পারেন।
আমি একটি প্রাইভেট ভিসা প্রসেসিং কোম্পানিতে জব করি। পাশাপাশি এই ব্লগটিতে লেখালেখি করি। আমি ব্রাক ইউনিভার্সিটে থেকে এমবিএ করেছি।