সার্বিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার অভিজ্ঞতা

ইউরোপের দেশ ইতালিতে পৌঁছানো অনেকেরই স্বপ্ন। কিন্তু এই স্বপ্নের পথে যে কী পরিমাণ বাধা, জঙ্গল, নদী এবং হাড়হিম করা ঠান্ডা অপেক্ষা করছে, তা অনেকেরই অজানা।

আজকের আর্টিকেলে আমি জানাবো, কীভাবে বসনিয়া, ক্রোয়েশিয়া ও স্লোভেনিয়া হয়ে ইতালিতে পৌঁছানো সম্ভব হলো এবং পথে কী কী ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল।

বসনিয়া থেকে ক্রোয়েশিয়া

যাত্রার শুরুটা হয়েছিল সার্বিয়া থেকে। সেখান থেকে বসনিয়া পৌঁছে একটি ঘরের মধ্যে দিনের বেলা অবস্থান করার পর রাত ১টার দিকে শুরু হয় আসল যাত্রা।

  • নদী ও জঙ্গল পথ: যাত্রাপথে প্রথমে একটি নদী বা জলাশয় পার হতে হয় যেখানে মাজা পর্যন্ত পানি ছিল। এরপর আসে একটি বড় নদী, যা পার হতে ছোট নৌকার সাহায্য নিতে হয়।

  • ১৮ ঘণ্টার হাঁটা পথ: বসনিয়া থেকে ক্রোয়েশিয়ার জাগ্রিব (Zagreb) পৌঁছাতে প্রায় ১৮ ঘণ্টা টানা হাঁটতে হয়। এর পুরোটাই ছিল ঘন জঙ্গল।

হাড়হিম করা ঠান্ডা ও শারীরিক চ্যালেঞ্জ

এই যাত্রার সবচেয়ে কঠিন দিকটি ছিল আবহাওয়া। অনলাইনের বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, হাঁটার সময় বাইরের তাপমাত্রা ছিল প্রায় ৮ ডিগ্রি, কিন্তু পানির তাপমাত্রা ছিল মাইনাসের কাছাকাছি।

  • ভেজা কাপড়ে যাত্রা: নদী পার হওয়ার সময় সবার জুতা ও প্যান্ট ভিজে গিয়েছিল। সেই ভেজা কাপড় গায়ের সাথেই শুকিয়েছে, কারণ থামার কোনো উপায় ছিল না।

  • আগুনের উত্তাপ: রাতে জঙ্গলের মধ্যে ১০টা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত আগুনের পাশে বসে রাত কাটাতে হয়। জ্যাকেট বা পর্যাপ্ত শীতের কাপড় না থাকায় আগুন না জ্বালালে অসুস্থ হয়ে পড়ার উপক্রম ছিল।

স্লোভেনিয়া বর্ডার ও পুলিশের সহযোগিতা

ক্রোয়েশিয়া থেকে স্লোভেনিয়া বর্ডারে পৌঁছানোর অভিজ্ঞতা ছিল কিছুটা ভিন্ন। এক প্রবাসী জানান, স্লোভেনিয়ার পুলিশ তুলনামূলকভাবে সাহায্যকারী।

  1. পুলিশের আচরণ: ক্রোয়েশিয়া থেকে স্লোভেনিয়ায় ঢোকার পর পুলিশ সাধারণত ব্যাক পাঠায় না। তারা ক্যাম্পে নিয়ে যায়।

  2. ক্যাম্পের খাবার: স্লোভেনিয়া ক্যাম্পের খাবার বেশ মানসম্মত ছিল যা ক্লান্ত শরীরকে কিছুটা সতেজ করতে সাহায্য করে।

  3. যাতায়াত খরচ: ক্যাম্প থেকে বের হয়ে বাসে করে ইতালির বর্ডারের দিকে যেতে হয়। এই বাস টিকিটের দাম ছিল প্রায় ৮ ইউরো ৫৫ সেন্ট (বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৮৫০ টাকা)।

ইতালি প্রবেশ

স্লোভেনিয়া থেকে বাসে করে ইতালির বর্ডারের খুব কাছে নামিয়ে দেওয়া হয়। সেখান থেকে মাত্র ২০ মিনিট হাঁটার পরেই তারা ইতালির সীমানায় প্রবেশ করেন।

অনলাইনের বিভিন্ন তথ্যানুসারে, একজনের অভিজ্ঞতায় যাত্রাপথে ভ্লগারের সাথে ছিল মোট ১৮ জন (২ জন গাইড বা ‘ডংকার’ সহ)। এদের মধ্যে ফিলিপাইন এবং শ্রীলঙ্কার ৩ জন নারীও ছিলেন। এই দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ পথে মোবাইল ফোন এবং ম্যাপ ছিল তাদের একমাত্র ভরসা।

উপসংহার

সার্বিয়া থেকে ইতালির এই পথটি যতটা রোমাঞ্চকর, তার চেয়েও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। একে “গেম” বলা হলেও এটি জীবনের বাজি রাখার মতো। ৫ দিনের এই জার্নিতে যেমন ছিল ১৮ ঘণ্টার হাঁটার ক্লান্তি, তেমনি ছিল মাইনাস তাপমাত্রায় ভিজে কাপড়ে টিকে থাকার লড়াই।

যারা এই পথে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন, তাদের জন্য এই অভিজ্ঞতাটি একটি সতর্কবার্তা ও নির্দেশিকা হতে পারে। সঠিক প্রস্তুতি এবং মানসিক শক্তি ছাড়া এই “গেম” জয় করা প্রায় অসম্ভব।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

প্রশ্ন: সার্বিয়া থেকে ইতালি যেতে কতদিন সময় লাগে?

উত্তর:  বসনিয়া, ক্রোয়েশিয়া ও স্লোভেনিয়া হয়ে ইতালি পৌঁছাতে তাদের প্রায় ৫ দিন সময় লেগেছে।

প্রশ্ন: স্লোভেনিয়া পুলিশ কি রিফিউজিদের ব্যাক পাঠায়? উত্তর: স্লোভেনিয়া পুলিশ সাধারণত ব্যাক পাঠায় না, বরং ক্যাম্পে নিয়ে খাবার ও বিশ্রামের ব্যবস্থা করে।

প্রশ্ন: ‘গেম’ (Game) বলতে কী বোঝায়? উত্তর: অবৈধ পথে বা জঙ্গল ও বর্ডার ক্রস করে এক দেশ থেকে অন্য দেশে (বিশেষ করে ইউরোপে) প্রবেশ করার চেষ্টা বা যাত্রাকে অভিবাসীদের ভাষায় “গেম” বলা হয়।

Leave a Comment