ইতালিতে গিয়ে কাজ করা বা সেটেল হওয়া অনেক বাংলাদেশি তরুণের স্বপ্ন। কিন্তু সঠিক তথ্যের অভাবে অনেকেই দালাল বা অনলাইনের চটকদার বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পা দেন। ইতালির ভিসা আসলে কীভাবে পাওয়া যায়? যাদের ইতালিতে কেউ নেই, তারা কি আবেদন করতে পারবেন?
আজকের এই গাইডে আমরা ইতালি প্রবাসীদের এর বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে জানব ইতালির স্পন্সর বা ওয়ার্ক ভিসার আদ্যোপান্ত।
ইতালির ভিসা পাওয়ার মূল মন্ত্র
ইতালির ওয়ার্ক ভিসা বা কাজের ভিসা পাওয়ার প্রক্রিয়াটি মূলত দুটি ধাপে সম্পন্ন হয়:
১. প্রথম ধাপ (ইতালি থেকে): ইতালিতে অবস্থানরত কোনো মালিক বা নিয়োগকর্তা আপনার জন্য ‘নুল্লা ওস্তা’ (Nulla Osta) বা ওয়ার্ক পারমিটের আবেদন করবেন।
২. দ্বিতীয় ধাপ (বাংলাদেশ থেকে): নুল্লা ওস্তা হাতে পাওয়ার পর বাংলাদেশে VFS Global-এর মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে ইতালিয়ান অ্যাম্বাসিতে পাসপোর্ট ও ভিসা আবেদন জমা দিতে হবে।
সতর্কতা: অনলাইনে একা একা বা আত্মীয় ছাড়া সরকারি ওয়েবসাইটে আবেদন করার কোনো সুযোগ নেই। অবশ্যই ইতালিতে একজন স্পন্সর থাকতে হবে।
ইতালির ভিসা প্রসেসিং
ইতালির ভিসা পাওয়ার প্রক্রিয়াটি নিচে সহজভাবে ব্যাখ্যা করা হলো:
ধাপ ১: স্পন্সর বা মালিকের আবেদন (Nulla Osta)
ভিসার মূল কাজ শুরু হয় ইতালি থেকে। এটি আপনি দেশ থেকে করতে পারবেন না।
-
কারা আবেদন করতে পারে? ইতালির কোনো ফ্যাক্টরি মালিক, রেস্টুরেন্ট মালিক, বা কৃষি খামারের মালিক যখন কর্মী প্রয়োজন মনে করেন, তখন তিনি সরকারের কাছে বিদেশি কর্মীর জন্য আবেদন করেন।
-
ডমেস্টিক ভিসা: কোনো ব্যক্তির যদি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নাও থাকে, কিন্তু তার বাৎসরিক আয় নির্দিষ্ট সীমার ওপরে থাকে, তবে তিনি তার বাসাবাড়ির কাজের জন্য (Domestic Worker) বাংলাদেশ থেকে লোক নেওয়ার আবেদন করতে পারেন।
-
ফলাফল: আবেদন মঞ্জুর হলে মালিক আপনার নামে একটি ‘ওয়ার্ক পারমিট’ বা ‘নুল্লা ওস্তা’ পাবেন এবং সেটি বাংলাদেশে আপনার কাছে পাঠাবেন।
ধাপ ২: ভিসা স্ট্যাম্পিং (Embassy Face)
ওয়ার্ক পারমিট বা নুল্লা ওস্তা হাতে পাওয়ার পর আপনার কাজ শুরু।
-
এই কাগজটি নিয়ে VFS Global-এর ওয়েবসাইটে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হবে।
-
নির্ধারিত তারিখে প্রয়োজনীয় সব ডকুমেন্ট ও পাসপোর্ট জমা দিতে হবে।
-
VFS Global মূলত একটি থার্ড পার্টি হিসেবে কাজ করে। তারা আপনার ফাইল ইতালিয়ান অ্যাম্বাসিতে পাঠাবে। অ্যাম্বাসি সব যাচাই করে ভিসা ইস্যু করলে আপনি পাসপোর্ট ফেরত পাবেন।
যাদের ইতালিতে কেউ নেই, তারা কী করবেন?
এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। শফিকুল ভাইয়ের মতে:
-
অনলাইন আবেদন: ইতালির ভিসা অনলাইনে নিজে নিজে আবেদন করার কোনো সিস্টেম নেই।
-
বাস্তবতা: আপনার যদি ইতালিতে পরিচিত আত্মীয়, বন্ধু বা বিশ্বস্ত কোনো মাধ্যম না থাকে, তবে আবেদন করা প্রায় অসম্ভব। কারণ, ইতালি থেকে কেউ স্পন্সর না করলে ভিসা প্রসেস শুরুই হবে না।
-
দালালের ফাঁদ: ফেসবুকে বা ইউটিউবে “ইতালির ভিসা দিচ্ছি” বা “অনলাইনে আবেদন করুন” টাইপের ভিডিও দেখে লোভে পড়বেন না। যাদের ইতালিতে কেউ নেই, তারাই মূলত প্রতারকদের প্রধান টার্গেট।
দালাল ও অনলাইন প্রতারণা থেকে সাবধান
বিশেষ সতর্কতা যা আপনার জানা জরুরি:
| প্রতারণার ধরণ | সঠিক তথ্য |
| ভিডিওর ক্যাপশনে ফোন নম্বর | কোনো ভালো কন্টেন্ট ক্রিয়েটর বা এজেন্সি কমেন্টে নম্বর দেয় না। এগুলো প্রতারক চক্রের কাজ। |
| “টাকা দিলে ভিসা হবে” | ইতালিতে মালিক বা স্পন্সর ছাড়া শুধু টাকা দিয়ে ভিসা হয় না। |
| আত্মীয় থাকলেই ভিসা হবে? | না। আপনার আত্মীয়ের যদি মালিকের সাথে পরিচয় না থাকে বা নিজের স্পন্সর করার যোগ্যতা না থাকে, তবে তিনি আপনাকে নিতে পারবেন না। |
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
প্রশ্ন: আমি কি অনলাইনে ইতালির ভিসার জন্য আবেদন করতে পারি?
উত্তর: না। ইতালির ওয়ার্ক ভিসার জন্য প্রথমে ইতালির কোনো নিয়োগকর্তাকে আপনার হয়ে আবেদন করতে হয়। আপনি সরাসরি বাংলাদেশ থেকে অনলাইনে আবেদন করতে পারবেন না।
প্রশ্ন: ‘নুল্লা ওস্তা’ (Nulla Osta) কী?
উত্তর: নুল্লা ওস্তা হলো ইতালির ইমিগ্রেশন অফিস থেকে দেওয়া একটি ছাড়পত্র বা ওয়ার্ক পারমিট। এটি ছাড়া আপনি ভিসার জন্য অ্যাম্বাসিতে ফাইল জমা দিতে পারবেন না।
প্রশ্ন: শফিকুল ইসলাম (Safikul The Beast) কি ভিসা প্রসেস করেন?
উত্তর: না। ভিডিওতে তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে তিনি কোনো ভিসা প্রসেস করেন না বা দালালির সাথে যুক্ত নন। তার নাম ব্যবহার করে কেউ টাকা চাইলে সাবধান থাকুন।
শেষ কথা
ইতালি যাওয়া মানেই জীবন পরিবর্তন, তবে ভুল পথে পা বাড়ালে সর্বস্ব হারানোর ঝুঁকি থাকে। আপনার যদি ইতালিতে বিশ্বস্ত লোক থাকে, তবেই আগান। আর যদি না থাকে, তবে অনলাইনে অপরিচিত কারো কথায় টাকা লেনদেন করবেন না। সঠিক নিয়ম জানুন, নিরাপদে থাকুন।
(বিদ্র: ভিসা সংক্রান্ত নিয়মাবলী ইতালিয়ান সরকার পরিবর্তন করার অধিকার রাখে। আবেদনের আগে সর্বদা অফিসিয়াল সোর্স যাচাই করে নিন।)
আমি একটি প্রাইভেট ভিসা প্রসেসিং কোম্পানিতে জব করি। পাশাপাশি এই ব্লগটিতে লেখালেখি করি। আমি ব্রাক ইউনিভার্সিটে থেকে এমবিএ করেছি।