ইউরোপের শ্রমবাজারে বর্তমানে বাংলাদেশিদের জন্য অন্যতম একটি গন্তব্য হলো মলদোভা (Moldova)। অনেকেই স্বপ্ন দেখছেন সেখানে গিয়ে ক্যারিয়ার গড়ার। কিন্তু বাস্তবে সেখানকার বেতন কত? কাজের পরিবেশ কেমন? আর ভিসা প্রসেসিংয়ে আসলে কত সময় লাগে?
আজকের আর্টিকেলে আমরা সরাসরি মলদোভা প্রবাসী এক বাংলাদেশি ভাইয়ের বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে এই প্রশ্নের উত্তরগুলো জানব। যিনি নারায়ণগঞ্জ থেকে গিয়ে বর্তমানে মলদোভায় কনস্ট্রাকশন সেক্টরে কাজ করছেন।
মলদোভা ভিসা প্রসেসিং
অনেকেই মনে করেন বা দালালরা আশ্বাস দেয় যে, ১৫-২০ দিন বা ২ মাসের মধ্যে মলদোভার ভিসা করে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
-
প্রসেসিং সময়: একটি বৈধ ওয়ার্ক পারমিট বের হতে এবং সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া শেষ করে মলদোভা পৌঁছাতে গড়ে ৭ থেকে ৮ মাস সময় লাগতে পারে। ভিডিওর তথ্যানুসারে, ওই প্রবাসীর সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া শেষ করতে প্রায় ২ বছর সময় লেগেছিল (অন্য দেশের রিজেকশনসহ)।
-
সতর্কতা: ওয়ার্ক পারমিটে কখনো ই-ভিসা (E-Visa) হয় না, এটি সাধারণত স্টিকার ভিসা হয়ে থাকে। তাই কেউ যদি আপনাকে খুব দ্রুত ই-ভিসায় নিয়ে যাওয়ার কথা বলে, তবে সতর্ক হোন।
প্রো টিপ: কোনো এজেন্সি যদি ১-২ মাসে ভিসা দেওয়ার গ্যারান্টি দেয়, তবে বুঝবেন সেখানে প্রতারণার সম্ভাবনা আছে। মলদোভার সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ওয়ার্ক পারমিট বের হতে সময় লাগে।
মলদোভায় কাজের ধরন ও ডিউটি আওয়ার
মলদোভায় মূলত কায়িক শ্রম বা হার্ড ওয়ার্কের চাহিদা বেশি। বিশেষ করে কনস্ট্রাকশন, পাইপ ফিটিং এবং এগ্রিকালচার সেক্টরে প্রচুর লোক নেওয়া হয়।
-
কাজের সময়: সাধারণত প্রতিদিন ৮ ঘণ্টা ডিউটি থাকে।
-
ওভারটাইম: কোম্পানিভেদে ওভারটাইমের সুযোগ কম। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ফিক্সড ডিউটি।
-
কাজের পরিবেশ: কাজগুলো বেশ কষ্টসাধ্য। রোদে পুড়ে বা খোলা মাঠে কাজ করতে হয়। কনস্ট্রাকশন সাইট বাসা থেকে দূরে হলে কোম্পানি যাতায়াতের ব্যবস্থা করে, আবার অনেক সময় সাইটে থাকার ব্যবস্থাও থাকে।
মলদোভায় বেতন কত? (Salary in Moldova)
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, মাস শেষে কত টাকা আয় করা সম্ভব?
-
গড় বেতন: ভিডিওর তথ্য অনুযায়ী, একজন সাধারণ শ্রমিকের বেতন ট্যাক্স কাটার পর প্রায় ১১,০০০ মলদোভান লেও (Leu) থাকে।
-
বাংলাদেশি টাকায়: বর্তমান রেট অনুযায়ী এটি বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৫০,০০০ থেকে ৬০,০০০ টাকা (খরচ বাদে সেভিংস হতে পারে)।
-
সুযোগ-সুবিধা: কোম্পানি সাধারণত থাকার জায়গা (Accommodation) ফ্রি দেয়। তবে খাবারের খরচ নিজেকে বহন করতে হয়।
খাওয়ার খরচ ও সেভিংস
নিজেকে রান্না করে খেতে হয় বলে খাবারের খরচ খুব বেশি হয় না। প্রবাসী ভাইটির মতে, কোম্পানি যদি থাকার জায়গা দেয়, তবে খাওয়া-দাওয়া এবং অন্যান্য খরচ বাদ দিয়ে মাসে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা দেশে পাঠানো সম্ভব।
নতুনদের জন্য পরামর্শ
আপনি যদি মনে করেন “বিদেশে গিয়ে কাজ শিখব”, তবে আপনি বড় ভুল করবেন। ইউরোপের দেশগুলোতে অদক্ষ (Unskilled) শ্রমিকদের চেয়ে দক্ষ (Skilled) শ্রমিকদের কদর অনেক বেশি।
যেসব কাজ শিখে যাওয়া উচিত:
১. কনস্ট্রাকশনের কাজ (রড বাইন্ডিং, শাটারিং)।
২. পাইপ ফিটিং বা প্লাম্বিং।
৩. ইলেকট্রিক্যাল কাজ।
৪. এগ্রিকালচার বা কৃষিকাজের অভিজ্ঞতা।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: আপনার যদি হাতের কাজ জানা থাকে, তবে আপনি মালিকের সাথে বার্গেইন করে বেতন বাড়িয়ে নিতে পারবেন। কিন্তু কাজ না জানলে আপনাকে সাধারণ লেবার হিসেবেই থাকতে হবে।
ভাষার সমস্যা ও সমাধান
মলদোভার নিজস্ব কোনো ভাষা নেই, সেখানে মূলত রোমানিয়ান ভাষা (Romanian Language) চলে। ইংরেজি খুব একটা চলে না।
-
নতুন অবস্থায় ভাষা বুঝতে সমস্যা হতে পারে।
-
তবে কাজের প্রয়োজনে আকার-ঙ্গিতে বা বেসিক শব্দ শিখে কাজ চালিয়ে নেওয়া যায়।
-
যাওয়ার আগে ইউটিউব থেকে বেসিক রোমানিয়ান শব্দগুলো শিখে গেলে অনেক সুবিধা হবে।
শেষকথা
যদি আপনি হার্ড ওয়ার্ক করতে প্রস্তুত থাকেন এবং মাসে ৫০-৬০ হাজার টাকা আয় করতে চান, তবে মলদোভা আপনার জন্য ভালো অপশন হতে পারে। তবে অবশ্যই দালালদের “দ্রুত ভিসার” ফাঁদে পা দেবেন না এবং দেশ থেকে অন্তত একটি কারিগরি কাজ শিখে তবেই ফ্লাই করবেন।
FAQs
১. মলদোভা যেতে কত দিন সময় লাগে?
উত্তর: সাধারণত ওয়ার্ক পারমিট ও ভিসা স্ট্যাম্পিং মিলিয়ে ৭-৮ মাস সময় হাতে রাখা উচিত।
২. মলদোভায় কি ই-ভিসায় যাওয়া যায়?
উত্তর: না, কাজের জন্য ওয়ার্ক পারমিট বা স্টিকার ভিসা প্রয়োজন হয়।
৩. মাসে কত টাকা আয় করা যায়?
উত্তর: ওভারটাইম ছাড়া সাধারণত ১১,০০০ লেও বা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৬০-৬৫ হাজার টাকা আয় হয়।
আমি একটি প্রাইভেট ভিসা প্রসেসিং কোম্পানিতে জব করি। পাশাপাশি এই ব্লগটিতে লেখালেখি করি। আমি ব্রাক ইউনিভার্সিটে থেকে এমবিএ করেছি।