বিদেশ যাত্রায় ডিজিটাল বিপ্লব: ‘আমি প্রবাসী’ অ্যাপে ঝঞ্ঝাটমুক্ত সেবা

দালালচক্রের খপ্পরে পড়ে সাড়ে সাত লাখ টাকা হারানোর পর এবার ভিন্ন পথে হাঁটছেন ভোলার মুরাদ। বিদেশ যাওয়ার সব প্রক্রিয়া এবার সারছেন নিজের হাতেই, সেটাও আবার ঘরে বসে অনলাইনে। দেশজুড়ে হাজারো মুরাদের মতো বিদেশগামী শ্রমিকদের জন্য স্বস্তির খবর নিয়ে এসেছে ‘আমি প্রবাসী’ অ্যাপ।

দালালমুক্ত বিদেশ যাত্রার নতুন দিগন্ত

“বিভিন্ন এজেন্সিতে ঘোরাঘুরি করে প্রায় সাড়ে সাত লাখ টাকা মার খেয়েছি এক প্রতারকের হাতে। গতকাল রাতে ‘আমি প্রবাসী’ অ্যাপস দেখতে পেলাম। এখন আর কোনো দালালের মাধ্যমে যেতে হচ্ছে না,” জানান মুরাদ।

জয়পুরহাট থেকে আসা আরেক চাকরিপ্রার্থী বলেন, “নিয়োগটি আমি অনলাইনে দেখলাম। ভাইভা দিয়ে সিলেক্ট হয়েছি। এখন মেডিক্যাল করতে হবে। খুব শীঘ্রই যেতে পারলে স্বাবলম্বী হতে পারবো বলে আশা করি।”

একটি অ্যাপেই সব সেবা

‘আমি প্রবাসী’ অ্যাপটিকে বিএমইটির ওয়ান স্টপ ডিজিটাল সলিউশন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে। বিদেশে যেতে আগ্রহী একজন ব্যক্তি যাত্রা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব তথ্য ও ধাপ এই অ্যাপেই পাচ্ছেন।

সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, ওমান, কাতার—যেকোনো দেশে যাওয়ার জন্য কীভাবে শুরু করতে হবে, কার সাথে যোগাযোগ করতে হবে, পাসপোর্ট, পুলিশ ক্লিয়ারেন্সসহ সব তথ্যই রয়েছে অ্যাপে।

যেসব সেবা মিলছে অ্যাপে

বর্তমানে ‘আমি প্রবাসী’ অ্যাপে ১০টিরও বেশি পরিসেবা যুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে:

  • বিএমইটি ডেটাবেজে নিবন্ধন
  • অনলাইনে বিদেশি চাকরি খোঁজা
  • ট্রেনিং কোর্সে আবেদন
  • প্রি-ডিপারচার ওরিয়েন্টেশন (পিডিও) সেশন বুকিং
  • ট্রেনিং সার্টিফিকেট ও স্মার্ট কার্ড
  • বিভিন্ন দাপ্তরিক ক্লিয়ারেন্স

একটি অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোন থাকলে যে কেউ ঘরে বসে কারো সাহায্য ছাড়াই এসব সেবা নিতে পারবেন। বিকাশ বা নগদের মাধ্যমে পেমেন্ট করে সরাসরি বিএমইটি ডেটা ব্যাংকে নিবন্ধন সম্পন্ন করা যাচ্ছে।

টিটিসিগুলোও এখন অনলাইনে

টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারগুলোকেও (টিটিসি) যুক্ত করা হয়েছে এই ডিজিটাল সার্ভিসে। ফলে বারবার টিটিসিতে না গিয়ে অনলাইনেই ভর্তি থেকে শুরু করে ট্রেনিং কোর্স সম্পূর্ণ করা যাচ্ছে।

একটি টিটিসির কর্মকর্তা জানান, “আমাদের একটা অ্যাপস আছে, এটার নাম ‘আমি প্রবাসী’। এই অ্যাপসের মাধ্যমে ভর্তিটাও অনলাইনে হতে পারছে।”

প্রতারণা রোধে ডিজিটাল ভেরিফিকেশন

অ্যাপটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফিচার হলো ডিজিটাল ভেরিফিকেশন সিস্টেম। বাংলা ট্র্যাক গ্রুপের পরিচালক নামির আহমেদ বলেন, “রিক্রুটিং এজেন্সি বললেও এখন আপনি নিজেই চেক করতে পারবেন আসলেই আপনার নামে চাকরিটা আসছে কিনা। বিদেশ যাওয়ার দুই-তিন সপ্তাহ আগে ‘আমি প্রবাসী’তে ভেরিফাই করলে আপনি দেখতে পারবেন চাকরিটা আসল নাকি নকল।”

তিনি আরও বলেন, এই অ্যাপের মাধ্যমে বিদেশগামী কর্মীর সময় যেমন বেঁচেছে, তেমনি কমেছে অর্থ ব্যয় এবং ভোগান্তি। এমনকি বিদেশে গিয়ে প্রতারিত হওয়ার সুযোগও কমেছে।

পরিচালনায় বিএমইটির ডিজিটাল পার্টনার

এই সম্পূর্ণ ডিজিটাল প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করছে জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) এর ডিজিটাল সার্ভিস প্রোভাইডার ‘আমি প্রবাসী’ লিমিটেড। বাংলা ট্র্যাক গ্রুপের এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জনশক্তি রপ্তানি বিষয়ক সংস্থা বিএমইটি জানান দিয়েছে সত্যিকারের ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপ।

বিদেশেও থাকবে সেবা

শুধু বিদেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া সহজ হয়নি, বিদেশে যাওয়ার পরেও সেবা পাবেন প্রবাসীরা। বিশ্বময় ছড়িয়ে থাকা প্রবাসীদের এক সুতোয় বেঁধে তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছে বাংলাদেশ।

এরই মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এই অ্যাপটি। সহজ ব্যবহারবিধির কারণে যেকোনো মোবাইল ব্যবহারকারীর পক্ষেই সব ধাপ নিজে নিজেই সম্পূর্ণ করা সম্ভব হচ্ছে।

প্রযুক্তির এই ছোঁয়ায় এখন দালালচক্রের ফাঁদ এড়িয়ে নিরাপদে, স্বচ্ছভাবে এবং কম খরচে বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন হাজারো প্রবাসী শ্রমিক।

Leave a Comment