ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে বর্তমানে বাংলাদেশিদের জন্য স্পেন (Spain) সবচেয়ে জনপ্রিয় গন্তব্য হয়ে উঠছে। কিন্তু স্পেনে আসলে কী ধরনের কাজের সুযোগ আছে? বেতন কেমন বা স্পেন ভিসা প্রসেসিং এর নিয়ম কী? বার্সেলোনায় ১৩ বছর ধরে বসবাসকারী এবং সুপারশপ ব্যবসার মালিক এক অভিজ্ঞ প্রবাসী বাংলাদেশির বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে আজকের এই আর্টিকেলটি সাজানো হয়েছে।
আপনি যদি স্পেন যাওয়ার পরিকল্পনা করেন, তবে এই তথ্যগুলো আপনার জানা অত্যন্ত জরুরি।
স্পেনে কোন কাজের চাহিদা বেশি?
স্পেনে কাজের অভাব নেই, তবে নির্দিষ্ট কিছু হাতের কাজ জানলে আপনি অন্যদের চেয়ে এগিয়ে থাকবেন। অভিজ্ঞ প্রবাসীদের মতে, বর্তমানে স্পেনে দুই ধরনের কাজের প্রচুর চাহিদা রয়েছে:
-
সেলুনের কাজ (Salon Work): যদি আপনার চুল কাটা বা গ্রুমিংয়ের অভিজ্ঞতা থাকে, তবে স্পেনে আপনার চাকরির নিশ্চয়তা অনেক বেশি। এখানে এই কাজের ভালো ডিমান্ড রয়েছে।
-
রান্নার কাজ (Cooking & Kitchen Helper): রেস্টুরেন্ট সেক্টরে কাজের প্রচুর সুযোগ। তবে শেফ হওয়ার আগে যদি অন্তত কাটাকাটি (Cutting/Chopping) বা প্রেপ করার কাজটুকুও জানা থাকে, তবে তা চাকরি পেতে বিশাল ভূমিকা রাখে। এই ছোট দক্ষতাটি ভবিষ্যতে বড় আয়ের পথ খুলে দেয়।
টিপস: কোনো কাজ না জেনে যাওয়ার চেয়ে দেশ থেকে অন্তত বেসিক কাটাকাটি বা সেলুনের কাজ শিখে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
স্পেনে মাসিক বেতন কেমন?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আয়-রোজগার কেমন? স্পেনের সরকারি নিয়ম এবং প্রবাসীদের কাজের ধরন অনুযায়ী বেতনের একটি স্পষ্ট ধারণা নিচে দেওয়া হলো:
-
মিনিমাম স্যালারি: স্পেনে একজন ফুলটাইম (দৈনিক ৮ ঘণ্টা, সপ্তাহে ৫ দিন) কর্মীর ন্যূনতম বেতন শুরু হয় ১,২২৫ ইউরো থেকে।
-
বাংলাদেশি টাকায় আয়: বর্তমান রেট অনুযায়ী, এই মিনিমাম স্যালারি বাংলাদেশি টাকায় দেড় লাখ টাকার (১.৫ লাখ+) উপরে।
-
অতিরিক্ত আয় (Overtime): বাঙালিরা সাধারণত ৮ ঘণ্টার বদলে ১০ ঘণ্টা এবং সপ্তাহে ৫ দিনের বদলে ৬ দিন কাজ করতে পছন্দ করেন। এই অতিরিক্ত পরিশ্রমে মূল বেতনের সাথে আরও ৫০০-৬০০ ইউরো যোগ করা সম্ভব। সব মিলিয়ে মাসে ১৭০০-১৮০০ ইউরো পর্যন্ত আয় হতে পারে।
স্পেনে থাকা-খাওয়ার খরচ কেমন?
বেতন যেমন ভালো, খরচের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। জীবনযাত্রার ব্যয় নির্ভর করে আপনি একা থাকছেন নাকি পরিবার নিয়ে।
| ধরণ | আনুমানিক মাসিক খরচ (ইউরো) | বিস্তারিত |
| ব্যাচেলর (একা) | ৫০০ – ৬০০ ইউরো | থাকা, খাওয়া এবং ব্যক্তিগত খরচ (ধূমপান বা চা-কফির অভ্যাস থাকলে খরচ বাড়তে পারে)। |
| ফ্যামিলি | ১২০০ – ১৪০০ ইউরো | বাসা ভাড়া এবং আনুষঙ্গিক খরচ। তবে ফ্যামিলির সদস্যরা কাজ করলে এই খরচ সামলানো সহজ হয়। |
যারা একটু হিসাবী, তারা খরচের পরেও প্রতি মাসে বেশ ভালো অংকের টাকা দেশে পাঠাতে বা জমাতে পারেন।
স্পেন ভিসা প্রসেসিং ও কাগজপত্র (Papers & Citizenship)
বর্তমানে ইউরোপের অন্যান্য দেশের (যেমন পর্তুগাল) তুলনায় স্পেনে কাগজপত্র বা বৈধ হওয়ার সুযোগ সবচেয়ে বেশি।
-
আরাইগো সোশিয়াল (Arraigo Social): আগে ৩ বছর অবৈধভাবে থাকার পর কাজের কন্ট্রাক্ট দেখিয়ে কাগজ করা যেত। নতুন নিয়মে এটি ২ বছরে নেমে এসেছে (যা মে মাস থেকে কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে)।
-
নাগরিকত্ব বা পাসপোর্ট: রেসিডেন্স পারমিট পাওয়ার পর টানা ১০ বছর স্পেনে থাকলে আপনি স্প্যানিশ পাসপোর্টের জন্য আবেদন করতে পারবেন।
-
সুযোগ-সুবিধা: একবার রেসিডেন্স কার্ড বা বৈধ কাগজ পেয়ে গেলে আপনি ব্যবসা করা, প্রপার্টি কেনা এবং জবলেস থাকলে সরকারি ভাতার সুবিধা পাবেন। এমনকি ট্যাক্স দেওয়া শুরু করলে মেডিক্যাল ও পড়াশোনার সুবিধাও পাওয়া যায়।
আবহাওয়া ও পরিবেশ
অনেকেই ইউরোপের হাড়কাঁপানো শীতের ভয়ে থাকেন। তবে স্পেনের আবহাওয়া অনেকটা বাংলাদেশের নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ার মতো।
-
লন্ডন বা অন্যান্য দেশের মতো এখানে তীব্র ঠান্ডা বা সবসময় বরফ পড়ে না।
-
শীতকালেও তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রির আশেপাশে থাকে, যা বাঙালিদের জন্য বেশ আরামদায়ক।
শেষ কথা ও সতর্কতা
স্পেন নিঃসন্দেহে একটি সম্ভাবনাময় দেশ। তবে দালালের কথায় প্ররোচিত না হয়ে সঠিক তথ্য জেনে সিদ্ধান্ত নিন। মনে রাখবেন:
-
শুরুতেই ১ লাখ টাকা আয়ের স্বপ্ন দেখবেন না, ধৈর্য ধরলে আয় বাড়বে।
-
অবশ্যই হাতে-কলমে কাজ (সেলুন বা রান্না) শিখে আসার চেষ্টা করবেন।
-
বৈধ হওয়ার আগ পর্যন্ত ধৈর্য ধরার মানসিকতা থাকতে হবে।
আপনার কি স্পেন বা ইউরোপের ভিসা নিয়ে আরও কোনো প্রশ্ন আছে? নিচে কমেন্ট করে জানান। আমরা পরবর্তী আর্টিকেলে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব!
আমি একটি প্রাইভেট ভিসা প্রসেসিং কোম্পানিতে জব করি। পাশাপাশি এই ব্লগটিতে লেখালেখি করি। আমি ব্রাক ইউনিভার্সিটে থেকে এমবিএ করেছি।